রাজধানী ডেস্ক | একাধিক গণমাধ্যমের বরাতে

রাজধানীর মিরপুর-১১ নম্বর সেকশনের বি ব্লকে সাত বছরের শিশু রামিসাকে নৃশংসভাবে হত্যা করার ঘটনায় দেশজুড়ে শোক, আতঙ্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। নিষ্ঠুর এই হত্যাকাণ্ড শুধু একটি পরিবারকে নয়, পুরো সমাজকে নাড়িয়ে দিয়েছে। মেয়েকে হারিয়ে সাংবাদিকদের সামনে কান্নায় ভেঙে পড়েন বাবা আবদুল হান্নান মোল্লা। তিনি বলেন, “আমার বিচার লাগবে না, আপনারা বিচার করতে পারবেন না—এমন ঘটনা যেন আর কোনো শিশুর সঙ্গে না ঘটে।
মঙ্গলবার (১৯ মে ২০২৬) সকালে ঘটে যাওয়া এই হৃদয়বিদারক ঘটনা রাজধানীর পল্লবী এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। নিহত রামিসা স্থানীয় একটি স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। তার বাবা আবদুল হান্নান মোল্লা ও মা পারভীন আক্তার দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে ওই ভবনের তিনতলার একটি ফ্ল্যাটে বসবাস করে আসছিলেন। পরিচিত ও নিরাপদ মনে করা সেই আবাসিক পরিবেশেই ছোট্ট শিশুটির এমন ভয়াবহ পরিণতি পুরো এলাকাবাসীকে স্তব্ধ করে দিয়েছে।
ঘটনার দিন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বড় বোনের সঙ্গে স্কুলে যাওয়ার কথা ছিল রামিসার। কিন্তু হঠাৎ করেই তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। পরিবারের সদস্যরা প্রথমে বাসার ভেতরে এবং পরে পুরো ভবনজুড়ে খোঁজ শুরু করেন। সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিবারের উদ্বেগও বাড়তে থাকে।
একপর্যায়ে রামিসার মা পাশের ফ্ল্যাটের দরজার সামনে শিশুটির একটি জুতা পড়ে থাকতে দেখেন। তখনই তার সন্দেহ হয়। তিনি পাশের ফ্ল্যাটের দরজায় বারবার নক করলেও ভেতর থেকে কেউ দরজা খুলছিল না। দীর্ঘক্ষণ ডাকাডাকি ও ধাক্কাধাক্কির পরও দরজা না খোলায় পরিস্থিতি আরও সন্দেহজনক হয়ে ওঠে।
পরে ৯৯৯-এ ফোন করা হলে পুলিশ ঘটনাস্থলে আসে। পুলিশ ফ্ল্যাটে প্রবেশ করে একটি কক্ষের খাটের নিচ থেকে রামিসার খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার করে। একইসঙ্গে শৌচাগারে রাখা একটি বালতির ভেতর থেকে উদ্ধার করা হয় তার বিচ্ছিন্ন মাথা। এই দৃশ্য দেখে উপস্থিত স্বজন ও স্থানীয়দের অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়েন।
ঘটনার পর পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয়রা জানান, এমন ভয়াবহ ঘটনা তারা আগে কখনো দেখেননি। শিশুটির পরিবারের আহাজারিতে পুরো ভবনের পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে।
পুলিশ ও তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, পাশের ফ্ল্যাটের ভাড়াটিয়া সোহেল রানা (৩৪) এই হত্যাকাণ্ডের মূল অভিযুক্ত। তিনি পেশায় একজন রিকশা মেকানিক। ঘটনার পর শৌচাগারের জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যান তিনি। পরে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
হত্যাকাণ্ডের পরপরই সোহেলের স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকেও আটক করা হয়। তদন্তকারীদের দাবি, সোহেলকে পালানোর সুযোগ করে দিতেই তিনি দীর্ঘ সময় দরজা খুলতে দেরি করেন। ফলে এই ঘটনায় তার সম্পৃক্ততাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
প্রাথমিক তদন্ত ও জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে পুলিশ জানিয়েছে, অভিযুক্ত সোহেল রানা শিশুটিকে টয়লেটে নিয়ে ধর্ষণ করে এবং পরে গলা কেটে হত্যা করে। পরে আলামত গোপন ও মরদেহ গুম করার উদ্দেশ্যে শিশুটির মাথা ও হাত বিচ্ছিন্ন করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
তদন্ত কর্মকর্তারা আরও জানিয়েছেন, অভিযুক্ত সোহেল রানা আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে সম্মত হয়েছে। এদিকে শিশুটির বাবা আবদুল হান্নান মোল্লা বাদী হয়ে পল্লবী থানায় মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় সোহেল রানা, তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার এবং অজ্ঞাতনামা আরও একজনকে আসামি করা হয়েছে।
বুধবার (২০ মে ২০২৬) অভিযুক্ত সোহেল রানাকে আদালতে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়েছে। অন্যদিকে তার স্ত্রীকে কারাগারে আটক রাখার আবেদন জানিয়েছে পুলিশ।
ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে মানবাধিকারকর্মীরা পর্যন্ত শিশু নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। অনেকে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে মামলাটি পরিচালনার দাবি জানিয়েছেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, একটি শিশুকে এমন নির্মমভাবে হত্যা করার ঘটনা পুরো সমাজের জন্য সতর্কবার্তা। তাদের মতে, আবাসিক এলাকায় শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরিবার, সমাজ ও প্রশাসন—সবার আরও দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন।
বিকল্প দৃষ্টিভঙ্গি
ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের আলোচনা শুরু হয়। কিছু ব্যবহারকারী দাবি করেন, অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আগে থেকেই সন্দেহজনক আচরণের অভিযোগ ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা উচিত। তবে তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, যাচাই ছাড়া কোনো তথ্য প্রচার করা ঠিক হবে না।
অন্যদিকে কিছু মানবাধিকার পর্যবেক্ষক মনে করছেন, শুধু বিচারের দাবি জানালেই হবে না; শিশুদের সুরক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও প্রশাসনিক উদ্যোগ প্রয়োজন। তারা আবাসিক ভবনে নজরদারি ব্যবস্থা জোরদার, শিশুদের নিরাপত্তা শিক্ষা এবং অপরাধপ্রবণ ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন।
এছাড়া কিছু মহল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দ্রুত অভিযানের প্রশংসা করলেও অন্যরা বলছেন, এমন ঘটনা প্রতিরোধে স্থানীয় পর্যায়ে আরও কার্যকর নজরদারি থাকা উচিত ছিল।
FurqanBarta এআই বিশ্লেষণ
পল্লবীর এই হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের নগরজীবনে শিশু নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি করেছে। পরিচিত আবাসিক পরিবেশে একটি শিশুর এমন ভয়াবহ মৃত্যু মানুষের মনে গভীর আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।
একদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দ্রুত অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে, অন্যদিকে সমাজের বড় একটি অংশ মনে করছে—এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে শুধু গ্রেপ্তার যথেষ্ট নয়। সামাজিক সচেতনতা, পারিবারিক সতর্কতা এবং স্থানীয় পর্যায়ে নিরাপত্তা নজরদারি আরও শক্তিশালী করা জরুরি।
বিশ্লেষকদের মতে, শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনা প্রতিরোধে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি মানসিক বিকারগ্রস্ত ও অপরাধপ্রবণ ব্যক্তিদের চিহ্নিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাচাই ছাড়া বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে না দেওয়ার প্রতিও সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।