চট্টগ্রামে তেলের জন্য দীর্ঘ লাইন, ভোগান্তি ছড়িয়ে পড়েছে দেশের বিভিন্ন জেলায়

রেশনিং, পাম্প বন্ধ, ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা—সরকার বলছে মজুত আছে, মাঠে দেখা যাচ্ছে চাপ

চট্টগ্রাম, ৬ এপ্রিল:
চট্টগ্রামে আজও পেট্রোল ও অকটেনের জন্য তীব্র ভোগান্তি অব্যাহত রয়েছে। নগরের অনেক ফিলিং স্টেশন হয় বন্ধ, না হয় সীমিত পরিমাণে তেল দিচ্ছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন বলছে, ডিপো থেকে সরবরাহ নির্ধারিত সময়েই আসার কথা থাকলেও বাস্তবে বহু পাম্পে তেল দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে, ফলে চালক ও যাত্রীদের দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। কোথাও কোথাও এই লাইন এক কিলোমিটার পর্যন্তও গড়িয়েছে।

চট্টগ্রামের এই সংকট এখন কেবল যানবাহনের নয়, বরং নগরজীবনের সামগ্রিক চাপের প্রতীক হয়ে উঠেছে। কর্মজীবী মানুষ, রাইডশেয়ার চালক, সিএনজি চালক, ব্যক্তিগত গাড়িচালক—সবাইকে তেলের জন্য মূল্য দিতে হচ্ছে সময়, শ্রম ও আয়ের ক্ষতিতে। নিউ এজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম শহরে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের হিসাবে ৪৬টি ফিলিং স্টেশন থাকলেও, অনেক জায়গায় মানুষকে এক পাম্প থেকে আরেক পাম্পে ঘুরতে হচ্ছে।

ভিডিও প্রতিবেদন: চট্টগ্রামের পেট্রোল পাম্পের বাস্তব চিত্র দেখুন

রাজধানী ঢাকাতেও পরিস্থিতি খুব একটা স্বস্তিদায়ক নয়। ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, কিছু চালক মাত্র ২ হাজার টাকার তেল তুলতে ১৫ ঘণ্টা পর্যন্ত লাইনে ছিলেন। অনেক পাম্পে মোটরসাইকেলের জন্য ৫০০–৬০০ টাকা এবং কারের জন্য ১,৫০০–২,০০০ টাকা পর্যন্ত সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। মিরপুর, তেজগাঁও, বিজয় সরণি, পারিবাগসহ একাধিক এলাকায় পাম্প বন্ধ বা অর্ধেক সরবরাহে চলার খবর পাওয়া গেছে।

চট্টগ্রামের বাইরে দেশের আরও বিভিন্ন অঞ্চলেও জ্বালানি পরিস্থিতি চাপের মধ্যে আছে। রংপুরে ৫০টির বেশি ফিলিং স্টেশন বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে, আর উত্তরাঞ্চলের আট জেলায় ট্যাংকার শ্রমিকদের ধর্মঘটের কারণে পার্বতীপুর রেলহেড অয়েল ডিপো থেকে ডিজেল, পেট্রোল ও অকটেন উত্তোলন বন্ধ হয়ে যায়। একই সঙ্গে রাজশাহীতে মজুতদারি ও চোরাচালান ঠেকাতে বিজিবি নজরদারি জোরদার করেছে।

ময়মনসিংহে ২৪ হাজার লিটার তেল অবৈধভাবে মজুত করার অভিযোগে একটি পাম্পে অভিযান চালিয়ে জরিমানা করা হয়েছে। এই ঘটনা দেখাচ্ছে, সরবরাহের ওপর বাস্তব চাপের পাশাপাশি কিছু ক্ষেত্রে মজুতদারি ও অনিয়মও সংকটকে তীব্র করছে। সরকারপক্ষও সাম্প্রতিক বক্তব্যে বলছে, আতঙ্কে অতিরিক্ত কেনাকাটা ও কিছু অসাধু গোষ্ঠীর মজুতদারি বাজারে চাপ বাড়াচ্ছে।

এদিকে জ্বালানি সংকটের প্রভাব শুধু পাম্পে সীমাবদ্ধ নেই; পণ্য পরিবহনেও এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড জানিয়েছে, চট্টগ্রাম, বেনাপোল, খুলনা ও উত্তরাঞ্চলের প্রধান রুটগুলোতে ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান ভাড়া ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, পরিবহন ব্যয় বাড়তে থাকলে নিত্যপণ্যের বাজারেও এর প্রভাব পড়বে।

সংকটের বড় প্রেক্ষাপট হলো বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক টানাপোড়েনের কারণে বাংলাদেশে জ্বালানি সাশ্রয়মূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে; সরকারি অফিসের সময় কমানো, বাজার-শপিং সেন্টার দ্রুত বন্ধের নির্দেশ, ফুয়েল রেশনিং, যানবাহনে বিক্রি সীমিতকরণ এবং কিছু ক্ষেত্রে পাম্পের সময়সূচি ছোট করার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ তার মোট জ্বালানি চাহিদার বড় অংশ আমদানির ওপর নির্ভর করায় আন্তর্জাতিক বাজারের ধাক্কা দেশের ভেতরের বিতরণেও দ্রুত প্রভাব ফেলছে।

তবে সরকার বলছে, সার্বিকভাবে মজুত পুরোপুরি ফুরিয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা তৈরি হয়নি। সরকারি ও আধা-সরকারি সূত্রে বলা হয়েছে, দেশের জ্বালানি সরবরাহ ধরে রাখতে বিকল্প উৎস থেকে আমদানি বাড়ানো হচ্ছে, বড় পরিসরে ডিজেল ও পেট্রোল কেনার প্রস্তাব নেওয়া হয়েছে, এবং পেট্রোল-অকটেনের কয়েক মাসের জোগান নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়েছে। একই সঙ্গে এপ্রিল মাসে জ্বালানির দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।

কিন্তু মাঠের বাস্তবতা ভিন্ন চিত্র দেখাচ্ছে। পাম্পের সামনে দীর্ঘ সারি, রেশনিং, বন্ধ গেট, কমে যাওয়া কাজের সময়, এবং মানুষের মধ্যে অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে বোঝা যাচ্ছে, এই সংকট শুধুমাত্র সরবরাহের হিসাবের নয়; এটি আস্থা, বণ্টন, বাজার-মনস্তত্ত্ব এবং নিয়ন্ত্রণব্যবস্থারও সংকট। চট্টগ্রামের বর্তমান দৃশ্য সেই জাতীয় চাপেরই একটি তীব্র প্রতিফলন।

সংক্ষিপ্ত উপসংহার

চট্টগ্রামে আজকের তেলের লাইন শুধু একটি শহরের ঘটনা নয়; এটি বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া জ্বালানি চাপের দৃশ্যমান বহিঃপ্রকাশ। সরকার মজুত ও আমদানির আশ্বাস দিচ্ছে, কিন্তু সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা বলছে—সংকট এখনো কাটেনি। দ্রুত, স্বচ্ছ ও সমন্বিত বিতরণব্যবস্থা নিশ্চিত না হলে এই ভোগান্তি আরও বাড়তে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *